লিভার

এলার্মিংভাবে বেড়ে যাওয়া রোগগুলোর মধ্যে ফ্যাটি লিভার অন্যতম। আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহারে মানুষের জীবনযাপন সহজ হওয়ায় বাড়চ্ছে রোগের চাপ। পরিশ্রমের তুলনায় খাদ্য গ্রহণ শরীরে প্রয়োজনের অতিরিক্ত ক্যালরী সরবরাহ করে যা আমাদের দেহে জমা থাকে। আর এই কাজটি করে লিভার। অত:পর রক্তের মাধ্যমে ফ্যাট সেল - এ জমা করার জন্য পাঠিয়ে দেয়। ফলে দেহে মেদ জমতে শুরু করে।

লিভার নষ্ট হবার কারণ !!

** সকালে মূত্রত্যাগ ও পর্যাপ্ত পানি পান না করা।
** অতিরিক্ত খাবার খাওয়া।
** সকালে নাস্তা না করা।
** মাত্রাতিরিক্ত ওষুধ সেবন করা।
** প্রিজারভেটিভ, ফুড কালার ও খাবার মিষ্টি করতে কৃত্রিম সুইটেনার ব্যবহার করা খাবার বেশি খাওয়া।
** অস্বাস্থ্যকর তেল ব্যবহার করা। অতিরিক্ত তেল ব্যবহার করা ভাজা-পোড়া জাতীয় খাবার খাওয়া ।
** বেশি পরিমাণে কাঁচা খাদ্য খাওয়ার অভ্যাসও লিভারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। 
** রাতে দেরিতে ঘুমাতে যাওয়া ও সকালে দেরি করে ঘুম থেকে ওঠা।
** অ্যালকোহল সেবন করা।

 
 
 

ফ্যাটি লিভার

পক্ষান্তরে রক্তে অতিরিক্ত যে ফ্যাটি এসিড থাকে লিভার সেগুলো টেনে নিয়ে নিজের কোষে জমা করতে থাকে। আর এভাবেই যখন ট্রাইগ্লিসারাইড, ফসফোলিপিড ও কোলেস্টেরল জমা হতে হতে লিভারের নিজস্ব ওজনের বৃদ্ধি পেয়ে ৫ -১০% শতাংশ ফ্যাট জমা হলেই চিকিৎসকগণ একে ফ্যাটি লিভার বলেন। একে স্টিয়াটসিসও বলে।

 

ফ্যাটি লিভার ডিজিজ বা এন.এ.এফ.এল.ডি.তে লিভারে অতিরিক্ত ফ্যাট জমা হতে হতে ইনফ্ল্যামেশন প্রভাবিত করে। ফলে লিভারের কোষগুলো নষ্ট হতে থাকে। একে Non Alcoholic Steatohepatitis বা সংক্ষেপে NASH বলে। 'অবিজ' মানুষদের ১৮.৫ শতাংশে এবং 'লিন' মানুষদের ২.৭ শতাংশে ন্যাশ পাওয়া গেছে। ন্যাশ-এ আক্রান্ত রোগীরা সাধারণতঃ লিভার সিরোসিস-এ আক্রান্ত হয়। এর থেকে লিভার ক্যান্সারও হতে পারে। 

ফ্যাটি লিভার ডিজিজ এর কারণ

চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষায় 'মেটাবলিক সিনড্রোম' বলে একটি কথা আছে। যে সকল ব্যক্তির বডি ম্যাস ইনডেক্স ৩০ কেজি/ স্কয়ার মিটার কে অতিক্রম করে যায়, তাদের কে 'Obese'(অবিজ) বলা হয় । অবিজ ব্যক্তিদের উচ্চ রক্তচাপ থাকলে, রক্তে অতিরিক্ত চর্বি থাকে এবং রক্তে সুগারের মাত্রা (ডায়াবেটিস) বেড়ে গেলে, তাদের মেটাবলিক সিনড্রোম-এর অন্তর্ভুক্ত ধরা হয়। অতিরিক্ত চর্বি তৈরী হয়ে যাদের ফ্যাটি লিভার ডিজিজ হয় তাদের প্রত্যেকের ক্ষেত্রে মেটাবলিক সিনড্রোমভুক্ত যে কোন একটি সমস্যাও সাথে থাকে। এছাড়া পলিসিস্টিক ওভারী সিনড্রোম, স্লিপ এপনিয়া ইত্যাদির সাথেও ফ্যাটি লিভারের সংযোগ দেখা যায়। তবে অন্যান্য কারণেও লিভারের এনএএফএলডি হতে পারে। যেমন: বিষক্রিয়া, বিভিন্ন ওষুধ (যেমন: টেমোক্সিফেন, এমাই্ওডেরন, ইস্ট্রোজেন, গ্লুকোকর্টিকয়েড ইত্যাদি), পাকস্থলির সার্জারী, দ্রুত ওজন হ্রাস, হাইপোথাইরয়ডিজম, অন্ত্রে অতিরিক্ত ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি, উইলসনস ডিজিজ ইত্যাদি।

ফ্যাটি লিভার থেকে লিভার সিরোসিস

ফ্যাটি লিভারে ইনফ্ল্যামেশন হলে লিভারের কোষতন্ত্র দিয়ে প্রতিস্থাপিত হতে থাকে। এ প্রক্রিয়াটিকে বলা হয় ফাইব্রোসিস। 
এনএনএফএল পর্যায়ে ফাইব্রোসিস থাকে না। এ পর্যায়ে প্রাথমিকভাবে লিভারে ফ্যাট জমা হয়। এক্ষেত্রে লিভার কোষের উল্লেখযোগ্য কোন ক্ষতি সাধন হয় না। ফলে একে সিম্পল স্টিয়াটসিস বা ফ্যাটি লিভার বলে। যথাযথ চিকিৎসা গ্রহণ না করলে এ অবস্থায় আক্রান্ত রোগীদের একটি অংশে বিভিন্ন উপায়ে লিভারে ইনফ্ল্যামেশন প্রভাবিত হয়ে ফাইব্রোসিস হতে পারে। ফলে এনএনএফএল থেকে রোগী ন্যাশ পর্যায়ে চলে যায়। এ অবস্থায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করলে রোগীর লিভারে ফ্যাট জমা হওয়া কমিয়ে আনা সম্ভব। 
ন্যাশ পর্যায়ে না গিয়েও নন-ন্যাশ ফ্যাটি লিভার থেকে লিভার ক্যান্সার হতে পারে। তবে তুলনামূলকভা্বে সে সংখ্যাটি কম। তাই এনএনএফএল হলে ঘরে বসে না থেকে চিকিৎসকের স্মরণাপন্ন হওয়া অত্যাবশ্যক ।

 

ফ্যাটি লিভার ডিজিজের ন্যাশ পর্যায়ে মৃদু হতে মারাত্মক ধরণের ফাইব্রোসিস হয়। লিভার কোষগুলো নষ্ট হয়ে তন্তু দিয়ে প্রতিস্থাপিত হয়। ফলে এ পর্যায়ে লিভার কোষের উল্লেখযোগ্য ক্ষতি সাধন হয়। ন্যাশ-এ আক্রান্ত প্রায় ৫০% রোগীর পরবর্তীতে লিভার সিরোসিস হয়। অত:পর এদের মধ্যে ৭% রোগী ১০ বছরের মধ্যে লিভার ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়। ন্যাশ পর্যায়ে চিকিৎসা গ্রহণ করলে ফাইব্রোসিসের গতি কমিয়ে আনা যায় বা নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা যায়। 
ফ্যাটি লিভারের উপসর্গ

ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত রোগীদের কোন সুনির্দিষ্ট উপসর্গ দেখা যায় না। তবে সাধারণত রোগীরা অত্যধিক দুর্বলতার অভিযোগ করে থাকেন, কেউ কেউ বুকের নিচে পেটের ডানদিকে ব্যথার কথাও বলেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ফ্যাটি লিভার আবিষ্কার হয় অন্য কোন একটি রোগের জন্য পরীক্ষা করতে গিয়ে। রক্তে লিভার এনজাইম মনিটর করতে গিয়ে কিংবা পিত্তে পাথর সন্দেহ করে পরীক্ষা করতে গিয়ে বা অন্য কোন কারণে আলট্রাসাউণ্ড করতে গিয়ে ফ্যাটি লিভার ধরা পড়ে।

ফ্যাটি লিভারের রোগীদের রক্তে লিভারের এনজাইম বেশী পাওয়া যায় এবং আলট্রাসনোগ্রামে লিভারে ফ্যাট পাওয়া যায়। তবে অন্যান্য বিভিন্ন রোগেও যেহেতু রক্তে লিভারের এনজাইম বাড়তে পারে সেহেতু চিকিৎসকগণ অন্যান্য কোন রোগের কারণে তা হয়নি বলে নিশ্চিত হলেই কেবল ফ্যাটি লিভার ডায়াগনসিস করেন। ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত রোগীদের রক্তে বাড়তি উইরিক এসিড, ট্রাইগ্লিসারাইড, গ্লুকোজ ইত্যাদি পাওয়া যেতে পারে। ফ্যাটি লিভার ধরা পড়েছে এধরণের রোগীদের এজন্য ডায়াবেটিস বা রক্তে সুগার নিয়ন্ত্রণকারী হরমোন ইনসুলিনের রেজিস্টেন্স (ইনসুলিনের সংবেদনশীলতা কমে যাওয়া), রক্তে অতিরিক্ত চর্বি, উচ্চ রক্তচাপ আছে কিনা পরীক্ষা করে দেখা প্রয়োজন।

স্টিয়াটোহেপাটাইটিস ডায়াগনসিস করা হয় বিভিন্ন ক্লিনিক্যাল ইনডিকেটর অথবা ফাইব্রোস্ক্যান বা লিভার বায়োপসির মাধ্যমে। লিভার বায়োপসি সূঁচ ঢুকিয়ে করতে হয় বিধায় অনেক রোগী করতে চান না। এক্ষেত্রে ফাইব্রোস্ক্যান একটি ভাল টেস্ট। তবে লিভারে কি পরিমাণ চর্বি জমা হলো তা আলট্রাসনোগ্রাম বা সিটি স্ক্যানের মাধ্যমে পরীক্ষা করে জানা হয়।

ফ্যাটি লিভার থেকে লিভারসিরোসিস এমনকি লিভার ক্যান্সারও হতে পারে। শুধু তাই নয়, বিভিন্ন স্টাডিতে দেখা গেছে ন্যাশ-এর সাথে রোগীদের (হাইপারকোয়াগুলেশন,থ্রম্বোফিলিয়া) রক্তের অধিক জমাট বেঁধে যাওয়া সংক্রান্ত প্রবণতার সম্পর্ক আছে। এছাড়া ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত রোগীদের হূদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়ার যথেষ্ঠ সম্ভাবনাও থাকে।

ফ্যাটি লিভার ডিজিজের চিকিৎসা 
১। সরাসরি ফ্যাটি লিভারের চিকিৎসা 
২। মেটাবলিক সিনড্রোমের চিকিৎসা। 
এক্ষেত্রে উচ্চ রক্তচাপ, ইনসুলিন রেজিসটেন্স, রক্তে অধিকমাত্রায় চর্বি, দেহের অতিরিক্ত মেদ ইত্যাদি বিষয়ের উপর খেয়াল রেখে লক্ষণ সাদৃশ্য ঔষধ প্রয়োগ করতে হয়।বিজ্ঞ হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকের তত্তাবধানে চিকিৎসা করলে আরগ্য লাভ সহজতর হয়।
এছাড়া খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন ও নিয়মিত ব্যায়ামের সমন্বয় জীবনাচার পরিবর্তন করাও অত্যাবশ্যক।

পাশাপাশি এলোপ্যাথিক যে ওষুধগুলো ওজন কমায়: অর্লিস্ট্যাট, সিবুট্রামিন, ইনসুলিনের সংবেদনশীলতা বাড়ায়: পাইওগ্লিটাজোন, মেটফরমিন। রক্তে চর্বি কমায়: ফাইব্রেট, ফাইব্রোসিস কমায়: এন্টাই অক্সিডেন্ট, আরসোডিঅক্সিকলিক এসিড ইত্যাদি। চিকিৎসকের পরামর্শক্রমে সেবনে করা যেতে পারে।

তবে জীবনাচার পরিবর্তন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষায় দেখা গেছে, খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন ও ব্যায়াম না করলে অন্যান্য ফারমাকোলজিক্যাল চিকিৎসা পদ্ধতিগুলো তেমন কোন উপকারে আসে না। জীবানাচার পরিবর্তনের মূল লক্ষ্য হলো, অতিরিক্ত মেদযুক্ত ব্যক্তিদের ক্রমান্বয়ে ওজন কমিয়ে উচ্চতার তুলনায় পর্যাপ্ত ওজনে নিয়ে আসা। অতিরিক্ত ওজনের ব্যক্তিদের শরীরে ইনসুলিনের সংবেদনশীলতা কমে যায়। ফলে শরীরের ফ্যাট সেলে সংরক্ষিত লিপিডগুলো ভেঙ্গে রক্তে মুক্ত ফ্যাটি এসিডের পরিমাণ বেড়ে যায়। লিভার এই অতিরিক্ত ফ্যাটি এসিড গ্রহণ করে নিজের ভিতর জমা করতে থাকে। বিভিন্ন স্টাডিতে দেখা গেছে, ওজন কমানো গেলে ইনসুলিনের সংবেনশীলতা বাড়ে। এছাড়াও খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের কারণে শরীরের ফ্যাট ভেঙ্গে শক্তি সরবরাহ করার পরিমাণ বাড়ে। ফলে খুব সহজেই লিভারের চর্বি কেটে যায়।

খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো হল: অতিরিক্ত ফ্রুক্টোজযুক্ত খাদ্য পরিহার করা। যেমন: সফটড্রিংক্স, কৃত্রিম জুস, সস ইত্যাদি । অতিরিক্ত ট্রান্সফ্যাটযুক্ত খাদ্য যেমন: বেশী তেলে ভাজা খাবার, ঘি দিয়ে তৈরী খাবার ইত্যাদি ।
'ওমেগা-থ্রি' যুক্ত খাবার যেমন: মাছ, তিসির তেল, আখরোট ইত্যাদি লিভারের চর্বি কমানোর জন্য উপকারী। সুতরাং প্রতিদিনের খাবারে এ ধরনের খাবার থাকা বাঞ্ছনীয়।

বিএমআই ৩৭.৫ কেজি/মিটারস্কয়ার-এর বেশী হলে এলোপ্যাথিক চিকিৎসকগণ ব্যারিয়াট্রি সার্জারী এডভাইস করেন। এ ধরনের সার্জারীতে পাকস্থলী কেটে ছোট করে দেয়া হয়। ফলে ব্যক্তির ক্ষুধা কমে যায় বা দ্রুত মিটে যায়। এছাড়া ফুড সাপ্লিমেন্ট বা অন্যান্য ফারামাকোলজিক্যাল চিকিৎসার বিভিন্ন ধরণের উপকার পাওয়া গেছে। যা বিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শক্রমে সেবন করা যেতে পারে।

এনএএফএলডি থেকে ন্যাশ সিরোসিস বা ক্যান্সার হয়ে গেলে একমাত্র নিরাময় হলো লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্টেশন করা। তবে ট্রান্সপ্ল্যান্টেশন করার পর পুনরায় ফ্যাটি লিভার হতে পারে। অন্যান্য যে কারণে ফ্যাটি লিভার ডিজিজ হয় সে সকল ক্ষেত্রে উক্ত কারণগুলোর চিকিৎসা করা জরুরী। শরীরের ওজনকে উচ্চতার তুলনায় নির্দিষ্ট মানে রাখার মাধ্যমে ফ্যাটি লিভার ডিজিজ প্রতিরোধ করা সম্ভব। শরীরের বিএমআই কে ১৮.৫ থেকে ২৪.৫-এর মধ্যে রাখলে ফ্যাটি লিভার ডিজিজ থেকেও যেমন মুক্তি পাওয়া যাবে তেমনি মেটাবলিক সিনড্রোমও প্রতিরোধ করা যাবে।

সুতরাং ফ্যাটি লিভার ডিজিজ ক্রমান্বয়ে ক্রনিক লিভার ডিজিজের অন্যতম মূল কারণ । তাই এই বিষয়ে সচেতনতা এবং অন্যদেরকে সচেতন করে তোলা অত্যাবশ্যক। অন্যথায় যন্ত্রনির্ভরতার কারনে আমাদের জীবন যাপন পরিশ্রমবিমুখ হওয়ায় ফ্যাটি লিভার ডিজিজ ও মেটাবলিক সিনড্রোম নিয়ন্ত্রণহীন ভাবে বেড়ে যাচ্ছে যা নিঃসন্দেহে আশংকাব্যঞ্জক।

 
 
 

.